আমরা এখন অতিক্রম করছি এক বরকতময় সময়। হজের মৌসুম, সম্মানিত মাস, পুণ্যময় দশ রজনী—চারদিকে তাসবিহ, তাকবির ও কুরবানির আমেজ। এটি মুমিনের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ দুই সময়ের একটি; অন্যটি হলো রমজান।
প্রতি বছর এই সময়ে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে যান বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববির আঙিনায়। মক্কা-মদিনাকে ঘিরে শুধু ওই ভূমিতেই নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বেই সৃষ্টি হয় এক ঈমান জাগানিয়া আবহ।
হজ ইসলামের অন্যতম রোকন ও ফরজ ইবাদত। এটি মুমিনের ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা আর আজীবনের স্বপ্ন। এক জন মুমিন তার জীবনভর অপেক্ষা করে কাবাঘর তাওয়াফের জন্য, মদিনায় গিয়ে প্রিয় নবীর রওজায় সালাম জানানোর জন্য। কাবা, মাতাফ, তালবিয়া, মাকামে ইবরাহিম, হাজরে আসওয়াদ, সাফা-মারওয়া—এসব পবিত্র স্থান ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গভীর আবেগ ও অনুরাগ।
রওজায়ে নববির শান্ত স্নিগ্ধতা, সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতিবিজড়িত মদিনার পথঘাট এবং হিজাযের ধূলিকণাও যেন মুমিন হৃদয়ে এক অপার টান সৃষ্টি করে। তাই সামর্থ্যবানরা ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও বারবার ছুটে যান মক্কা-মদিনার পথে। আর যাদের সামর্থ্য নেই, তারাও আল্লাহর দরবারে হাত তুলে হজের তাওফিক কামনা করেন। এমনকি অনেক দরিদ্র মানুষও সামান্য সামান্য করে সঞ্চয় করেন—একদিন হারামাইনের মাটিতে পৌঁছানোর আশায়।
এই ভালোবাসা, এই আকুলতা—সবই মুমিনের ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। হজ মানে তো আল্লাহর ঘরের অতিথি হওয়া, তার সান্নিধ্যে ধন্য হওয়া। তার দরবারে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা। এটি বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও বিশ্বাসের এক অনন্য প্রকাশ।
হজের প্রতিটি আমলই হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের ঈমান, ত্যাগ ও ভালোবাসার স্মৃতিবাহী। আল্লাহ সেই ভালোবাসাকে এতটাই পছন্দ করেছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্য তা ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সত্যিই—ভালোবাসার এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
বিশ্বের মুসলমানরা বছরজুড়ে এই আহ্বানের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু যারা হজে যেতে পারবেন না, তাদের জন্যও এই সময়টি অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ। যিলহজের প্রথম দশ দিন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এ সময়ে আমাদের করণীয়—
রোজা রাখা, নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা, রাত জেগে ইবাদত করা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, তাওবা-ইস্তেগফার করা, তাকবীরে তাশরীক আদায়ে যত্নবান হওয়া এবং কোরবানির প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
হজের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য, সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জন। তাই যারা হজে যেতে পারেন না, তারাও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারেন। পাশাপাশি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে হজের শিক্ষা এবং ইতিহাস জানা ও চর্চা করা উচিত।
প্রতি বছর হজ ও কোরবানি আমাদের জন্য যে শিক্ষা ও বার্তা নিয়ে আসে, তা শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে সেই ভাষণের দিকনির্দেশনা আমাদের পথ দেখায়। তাই এই বরকতময় সময়ে সেই ভাষণ নতুন করে পড়া ও অনুধাবন করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সবশেষে—হজে যেতে না পারার আক্ষেপ হৃদয়ে জীবন্ত রাখা উচিত, তবে তা যেন হতাশা না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রেরণা হয়। তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে এবং দোয়া করতে হবে—তিনি যেন আমাদেরও একদিন তার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দান করেন।
তিনি যেন তার প্রিয় কাবা এবং প্রিয় নবীর রওজা সকল মুমিনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তিনি তো সর্বশক্তিমান—সবকিছুর মালিক, সবকিছুই তার অধীন।